শূন্য ক্যানভাস বা সাদা পাতায় মার্কার পেন অথবা মোটা ব্রাশ দিয়ে একটি লাইনের যাত্রা শুরু হত। আর যখন সেই লাইন গন্তব্যে পৌঁছত তখন দেখতে পেতাম একটা নতুন ছবির জন্ম হয়েছে। সেইসব ছবিতে কখনও মানব-মানবীর মুখ আবার ফুলের বিভিন্ন আকৃতি। মুখগুলো আমাদের ভীষণ চেনা। কারণ শহরের রাস্তায়, গ্রামের মেঠো আলপথে তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে একাধিকবার।
গত বছরের মাঝখানে কোনও এক সময়ে শান্তিনিকেতনে দূরদর্শনের গেস্ট হাউসে আমার এক শিল্পীবন্ধু তাঁর মুঠোফোনের গ্যালারি থেকে যোগেনদার আঁকা একটা রঙিন ছবি দেখিয়েছিলেন। সেই ছবি এক প্রৌঢ়া রমণীর। সংসারে দীর্ঘদিনের জীবনসংগ্রামে তিনি ক্লান্ত, ক্লান্ত তাঁর বক্ষযুগল। যোগেন চৌধুরীর চিত্রায়িত এই ছবির স্তনযুগলের মধ্যে শিল্পরসিকরা যদি যৌনতা খুঁজতে যান তাহলে ভুল করবেন। এর মধ্যে রয়েছে সংসারে দীর্ঘ যাত্রার প্রকাশ, দৈনন্দিন কর্তব্যপালনে নিজেকে নিঃশেষ করে দেবার প্রতিচ্ছবি!

সমকালীন চিত্রচর্চার কিংবদন্তী চিত্রকর যোগেন চৌধুরী এখন অতীত। কিন্তু তাঁর হাতে আঁকা ছবিগুলি তাঁর উপস্থিতির কথা সরবে ঘোষণা করছে। দেহের মৃত্যু ঘটলেও শিল্প তো চিরন্তন। আর পাঁচজন চিত্রশিল্পীর মতো নান্দনিক পথে তাঁর চলা। নানা বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে তাঁর সৃষ্টি নিজস্ব স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে! একজন সার্থক শিল্পীর তো এমনটাই হওয়া উচিত।
ওপার বাংলায় জন্ম হলেও দেশভাগের যন্ত্রনা নিয়ে এপারে এসেছিলেন। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে আরেকটি ট্রেনে বালিগঞ্জ স্টেশনে নেমে মনোহরপুকুরের পি ৯৫বি বাড়িতে আশ্রয়। কারণ জ্যাঠামশাই ছিলেন পুলিশ আধিকারিক আর উক্ত ঠিকানার বাড়িটা ছিল পুলিশ ব্যারাক। বর্তমানে সেটিই আমার পৈতৃকবাড়ি আর ঠিকানা বদলে এখন সেটা ২২/২৩এ মনোহরপুকুর রোড। যোগেনদার কাছেই শুনেছিলাম এই বাড়ির একতলার কোনও একটা ঘরে তাঁর প্রথম ছবি আঁকা, ছবিটা ছিল ময়ূর। ২০১১ সালে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসের কামরায় যোগেনদার সঙ্গে আলাপ। সেই পরিচয়পর্বের কারিগর ছিলেন শীর্ষেন্দুদা মানে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। এরপর থেকে অনেকরকম অবকাশে দেখা, ফোনে কথা তো চলতই। ২০১২ সালের শেষে শীতের শুরুতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বললেন ওঁর সঙ্গে শান্তিনিকেতন যেতে। সেখানে, ‘swsaad’ শীর্ষক আর্ট সেন্টারের বার্ষিক অনুষ্ঠানে যোগেন চৌধুরী সম্মানিত করলেন সৌমিত্রকাকুকে। নতুন প্রদর্শনীর খবর পেলে ছুটে যাই, ওঁর নতুন সৃষ্টি দেখি। সংবাদপত্রের কাজে মাঝে-মধ্যে যোগাযোগ হয়। পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে করোনাকাল, মানবসভ্যতা গৃহবন্দি কিন্তু তার ভেতরেও খবর পাই বাড়িতে থেকেও যোগেনদা তাঁর সৃষ্টিতে মগ্ন। দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ। তখন সেটাই স্বাভাবিক। লকডাউন একটু শিথিল হতেই আবার যোগাযোগের সূত্রপাত।

হঠাৎ একদিন যোগেনদা ডেকে বলেন, সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার আর্ট সেন্টার চারুবাসনার কাজে তোমাকে যুক্ত করব। আমার জীবনে শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। মূলত সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডর আয়োজকের ভূমিকা ছিল আমার। পাস্ট টেন্স ব্যবহার করলাম সচেতনভাবেই কারণ যোগেনদার অবর্তমানে চারুবাসনার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অন্য আরও অনেকের মতো আমিও অন্ধকারে। বাকিটা সময়ই বলবে। স্বাধীনতা আর ভালোবাসা দুটোই পেলাম ওঁর কাছ থেকে। তবে ভালোবাসা আর প্রশ্রয়ের মাত্রাটা একটু বৃদ্ধি পেতেই ওঁকে ঘিরে থাকা পারিষদবর্গ এবং আমার কিছু গুণগ্রাহীদের গাত্রদাহ হল! অনেক চেষ্টা আর পরিশ্রম করা হতে থাকল আমার এবং যোগেনদা সহ চারুবাসনার মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে। কিন্তু যোগেনদা নির্বিকার। আমার প্রতি তাঁর আস্থা অটুট রইল। আশাভঙ্গ হল আমার আপনজনেদের।
এসবের মাঝে নানা আড্ডায় আর গল্পে যোগেনদা নিজের ফেলে আসা দিনগুলো সম্পর্কে কত মজার গল্প করতেন। নিজের ছবি নিয়ে খুব একটা তাত্ত্বিক আলোচনা করতে দেখিনি! সহজবোধ্য ভাষাতেই বিশ্লেষণ করতেন। বলতেন, ‘আমি যখন একটা মানুষের মুখ আঁকি তখন তার মুখ্যমন্ডল দিয়ে একটা ইতিহাস বলতে চেষ্টা করি।’
সনৎ করের ছবি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল ছবি আঁকতে। কিন্তু এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো,চিত্রকলার জগতে আমার কোনও প্রথাগত শিক্ষা নেই আর আমি নিজেকে শিল্পী বলে মনেই করি না। অবশ্য আমার ছবি আঁকার কথা শুনে যোগেনদা আমাকে উৎসাহ যোগাতে শুরু করেন! আমার ছবিগুলো সম্পর্কে জানতে চান, দেখতে চান। হতবাক হয়ে যেতাম যখন দেখতাম সেইসব ছবি দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করতেন! বলতেন জার্মান চিত্রকর পল ক্লি ছবি পর্যবেক্ষণ করতে।

বর্ণময় আর দীর্ঘজীবনে যোগেনদা হাওড়া জেলা স্কুল, মাদ্রাজের চাকরি, রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর, বিশ্বভারতী কলাভবনের অধ্যক্ষ, রাজ্যসভার সাংসদসহ নানান ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। ছবি আঁকার পাশাপাশি সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল দেখার মতো ! কারুর প্রয়োজনে পাশে থাকতেন নীরবে। মান, যশ, খ্যাতি, অর্থ, সম্মান পেয়েও যোগেন চৌধুরীর পা দুটো কিন্তু মাটিতেই ছিল। তবে লেঠেল মানে হালআমলের ভাষায় বাউন্সার পরিবৃত হয়ে ওঁর বিদায় নেওয়াটা সম্ভবত যোগেনদারও পছন্দ হত না কারণ উনি উনি নিজেকে চিরকাল মাটির কাছাকাছিই রেখেছিলেন।

